কুরবানীর চাঁদ ওঠার পর কি চুল ও নখ কাটা যাবে না?
কুরবানীর চাঁদ ওঠার পর চুল ও নখ কর্তন করা যাবে কিনা ?
প্রশ্ন:- ক্বুরবানীর চাঁদ ওঠার পর কি চুল ও নখ কাটা যাবে না?
উত্তর:- যে ব্যক্তি ক্বুরবানী করার নিয়ত করবে তার পক্ষে ক্বুরবানী না করা পর্যন্ত চুল, নাভীর নিচের পশম এবং নখ কাটা থেকে বিরত থাকা হল মুস্তাহাব বা উত্তম। তবে উক্ত মুস্তাহাব নির্দেশিকার প্রতি তখন আমল করা যাবে, যখন ক্বুরবানী করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে গিয়ে নাভীর নিচের পশম এবং নখ কাটার সময়সীমা চল্লিশ দিনের অতিরিক্ত না হয়। আর যদি এ বিধানের উপর আমল করতে গিয়ে নাভীর নিচের পশম এবং নখ কাটার সময়সীমা চল্লিশ দিনের অতিরিক্ত হয়, তাহলে উক্ত বিধানের প্রতি আমল করা যাবে না। কারণ, চল্লিশ দিনের মধ্যে নাভীর নিচের পশম, নখ এবং বগলের চুল কাটা জরুরী। চল্লিশ দিন অতিক্রম করা নাজায়েয ও মাকরূহে তাহরীমী। ফলে মুস্তাহাব কর্মের প্রতি আমল করতে গিয়ে মাকরূহে তাহরীমীর সাথে জড়িত হওয়া নিষিদ্ধ ও নাজায়েয।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَنْ كَانَ لَهُ ذِبْحٌ يَذْبَحُهُ فَإِذَا أُهِلَّ هِلَالُ ذِي الْحِجَّةِ فَلَا يَأْخُذَنَّ مِنْ شَعْرِهِ وَلَا مِنْ أَظْفَارِهِ شَيْئًا حَتَّى يُضَحِّيَ
অনুবাদ:- যে লোকের কাছে ক্বুরবানীর পশু আছে সে যেন জিলহজ্জ (কুরবানীর) মাসের নতুন চাঁদ দেখার পর ঈদের দিন ক্বুরবানি করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে। ( মুসলিম শরীফ, হাদিস: 5015)
রাদ্দুল মুহতার নামক কিতাবে রয়েছে-
فَهَذَا مَحْمُولٌ عَلَى الْأَدَبِ بِالْإِجْمَاعِ
অর্থাত:- ওলামা তথা সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী এ হুকুম টি হল মুস্তাহাব। (রাদ্দুল মুহতার, খন্ড: 1, পৃষ্ঠা: 565)
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ وَأَرَادَ بَعْضُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعْرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا وَفِي رِوَايَةٍ فَلَا يَأْخُذَنَّ شَعْرًا وَلَا يَقْلِمَنَّ ظُفُرًا وَفِي رِوَايَةٍ مَنْ رَأَى هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ وَأَرَادَ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَأْخُذْ مِنْ شَعْرِهِ وَلَا مِنْ أَظْفَارِهِ . رَوَاهُ مُسْلِمٌ
অনুবাদ:- হযরত উম্মে সালামাহ্ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যখন জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ শুরু হয়ে যায় আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে, সে যেন নিজের চুল ও চামড়ায় কোনো রকম হাত না দেয়। অন্য এক বর্ণনায় আছে, সে যেন নখ স্পর্শ না করে ও নখ না কাটে। অপর এক বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি জিলহজ্জ মাসের নব চাঁদ দেখবে ও কুরবানী করার নিয়্যাত করবে সে যেন নিজের চুল ও নিজের নখগুলি কর্তন না করে। {মিশকাত শরীফ, হাদিস: 1459, মুসলিম: হাদিস: 1977, নাসাঈ 4364, ইবনে মাজাহ্, হাদিস: 3149, আহমদ, হাদিস: 26474, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হাদিস: 19043, শুআবুল ঈমান, হাদিস: 6948, তিরমিযী, হাদিস: 1163, সহীহ আল জামি, হাদিস: 520}
উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরীন ক্বুরআন, হাকীমুল উম্মত হযরত আল্লামা মাওলানা মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন নায়ীমী রহমতুল্লাহি তা'আলা আলাইহি বলেছেন:
"অর্থাত যে ধনী ওয়াজিব হিসেবে কিংবা দরিদ্র নফল হিসেবে ক্বুরবানী করার ইচ্ছা রাখে, সে ক্বুরবানির ঈদের চাঁদ দেখা থেকে ক্বুরবানি করা পর্যন্ত নখ, চুল এবং শরীরের মৃত চামড়া ইত্যাদি না নিজে কাটবে, না কারও দ্বারা কাটাবে; যাতে হাজীদের সাথে কিছুটা হলেও সাদৃশ্য হয়ে যায়। কেননা, তারা ইহরামের ক্ষৌরকর্ম করতে পারেন না এবং যেন ক্বুরবানির প্রতিটি চুল ও নখের ফিদিয়া (বিনিময়) হয়ে যায়। এ হুকুম মুস্তাহাব নির্দেশ; ওয়াজিব (অনিবার্য) নির্দেশ নয়। সুতরাং ক্বুরবানিদাতার জন্য ক্ষৌরকর্ম না করানো উত্তম, আবশ্যকীয় নয়। এ থেকে বুঝা গেল যে, উত্তম লোকদের সাথে সাদৃশ্য রাখা উত্তম।
(মিরআতুল মানাজীহ শারহু মিশকাতুল মাসাবীহ (বাংলা), খন্ড: 2, পৃষ্ঠা: 445,446)
আলা হযরত রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
"এ হুকুম টি হল শুধুমাত্র মুস্তাহাব বা উত্তম। করলে ভালো। না করলে কোনো ক্ষতি নেই। একে না ফরমানি বলা যাবে না আর না ক্বুরবানীতে কোনো ক্ষতি হবে। বরং যদি কেউ ৩১ দিনের মধ্যে কারণবশত অথবা অকারণে নখ ও চুল না কেটে থাকে আর জিলহজ্জ মাসের চাঁদ উঠে গেল, তাহলে যদিওবা সে ক্বুরবানীর ইচ্ছা রাখে, এ মুস্তাহাব (বিধানের) -এর প্রতি আমল করতে পারবে না। কেননা, এখন দশ দিন পর্যন্ত রাখলে নখ কাটার এবং চুল কাটার ৪১ দিন হয়ে যাবে। আর চল্লিশ দিনের অতিরিক্ত (নখ ও নাভির নিচের চুল) না কাটা গুনাহ। মুস্তাহাব কর্মের জন্য গুনাহ করতে পারবে না"
(ফাতওয়া রাযাবীয়াহ, খন্ড 20 পৃষ্ঠা 353-354, প্রকাশিত রেযা একাডেমী, মুম্বাই)
ক্বুরবানী না করেও ক্বুরবানীর সওয়াব অর্জন করা যায়:
সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে বললেন :
أُمِرْتُ بِعِيدِ الْأَضْحَى عِيدًا جَعَلَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ قَالَ الرَّجُلُ أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ أَجِدْ إِلَّا مَنِيحَةً أُنْثَى أَفَأُضَحِّي بِهَا قَالَ لَا وَلَكِنَّكَ تَأْخُذُ مِنْ شَعْرِكَ وَتُقَلِّمُ أَظْفَارَكَ وَتَقُصُّ شَارِبَكَ وَتَحْلِقُ عَانَتَكَ فَذَلِكَ تَمَامُ أُضْحِيَّتِكَ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
অনুবাদ:- ক্বুরবানীর দিনকে ঈদের দিন করার জন্য আমাকে আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহ্ তাআলা এই উম্মতের জন্য এটা সাবস্ত্য করেছেন। তখন ঐ ব্যক্তি বলল: যদি আমি দুধপান করার জন্য অন্যর দান করা পশু ব্যতীত অন্য কিছু না পাই, তা হলে কি আমি তা-ই ক্বুরবানী করব? তিনি বললেন: না, কিন্তু তুমি (নামাযের পর) তোমার চুল, নখ উপড়ে ফেলবে এবং গোঁফ ছাঁটাই করবে এবং তোমার নাভীর নিচের পশম কামাবে; এটিই হবে আল্লাহ্'র নিকট তোমার ক্বুরবানীর পূর্ণতা।
(সুনানে আন-নাসাঈ, হাদিস: 4365)
উক্ত হাদিস উল্লেখ করার পর হুযূর সাদরুশ শারীয়াহ রহমতুল্লাহি তা'আলা আলাইহি বলেন:
"যাদের ক্বুরবানীর তৌফিক হবে না, সে এ সমস্ত কর্ম করলে ক্বুরবানীর সওয়াব অর্জন করে নিবে।
(বাহারে শরীয়ত, হিসসা: 15, পৃষ্ঠা: 330, প্রকাশিত দাওয়াতে ইসলামী)
মুফারসিরীন ক্বুরআন হাকীমুল উম্মত হযরত মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন নায়ীমী রহমতুল্লাহি তা'আলা আলাইহি বলেছেন:
"বরং যে ক্বুরবানি করতে পারে না সে এই "আশরা " (জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন) ক্ষৌরকর্ম করাবে না; বরং ক্বুরবানির ঈদের দিন নামাযের পর ক্ষৌরকর্ম করলে ইনশা-আল্লাহ সওয়াব পাবে। কিছু সংখ্যক বর্ণনায় এমন রয়েছে।
(মিরআতুল মানাজীহ শারহু মিশকাতুল মাসাবীহ (বাংলা), খন্ড: 2, পৃষ্ঠা: 446, টীকা: 14)
والله أعلم بالصواب
ইতি
☀️ মুফতি গুলজার আলী মিসবাহী ☀️
হেমতাবাদ, রায়গঞ্জ, উত্তর দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।☀️
29/11/1443 হিজরী
30/06/2022 খ্রিস্টাব্দ
রোজ- বৃহস্পতিবার
Comments -