স্ত্রীকে পর্দাশীল বানানো ও পর্দার যাবতীয় সরঞ্জাম প্রদান করা স্বামীর দায়িত্ব
🏵️💠 স্ত্রীকে পর্দাশীল বানানো ও পর্দার যাবতীয় সরঞ্জাম প্রদান করা স্বামীর দায়িত্ব 💠🏵️
সম্মানিত সুধী! একজন স্বামীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো নিজের স্ত্রীকে আল্লাহভীরু করে গড়ে তোলা এবং ইসলামের বিধান অনুযায়ী পর্দাশীল জীবনযাপনে সহযোগিতা করা। কারণ পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি। পরিবার যদি ইসলামী আদর্শে গড়ে ওঠে, তবে সমাজও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।
💠আল্লাহ তা'লা ইরশাদ করেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
অনুবাদ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।
{{সূরাহ আত-তাহরীম-৬৬ আয়াত নং-৬}}
এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, একজন ব্যক্তি যেমন নিজের আমল-আখলাকের জন্য দায়ী, তেমনি নিজের পরিবারকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করার দায়িত্বও তার ওপর অর্পিত হয়েছে। তাই একজন স্বামীর কর্তব্য হলো স্ত্রীকে পর্দার গুরুত্ব বোঝানো এবং পর্দা পালনে উৎসাহিত করা।
সম্মানিত সুধী! পর্দা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এটি শুধু পোশাকের বিষয় নয়; বরং লজ্জাশীলতা, শালীনতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার প্রতীক।
💠আল্লাহ তা'লা ইরশাদ করেন—
وَقُلْ لِّلْمُؤْمِنٰتِ یَغْضُضْنَ مِنْ اَبْصَارِهِنَّ وَیَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ وَلَا یُبْدِیْنَ زِیْنَتَهُنَّ اِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْیَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰی جُیُوْبِهِنَّ۪ وَلَا یُبْدِیْنَ زِیْنَتَهُنَّ اِلَّا لِبُعُوْلَتِهِنَّ اَوْ اٰبَآىِٕهِنَّ اَوْ اٰبَآءِ بُعُوْلَتِهِنَّ اَوْ اَبْنَآىِٕهِنَّ اَوْ اَبْنَآءِ بُعُوْلَتِهِنَّ اَوْ اِخْوَانِهِنَّ اَوْ بَنِیْۤ اِخْوَانِهِنَّ اَوْ بَنِیْۤ اَخَوٰتِهِنَّ اَوْ نِسَآىِٕهِنَّ اَوْ مَا مَلَكَتْ اَیْمَانُهُنَّ اَوِ التّٰبِعِیْنَ غَیْرِ اُولِی الْاِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ اَوِ الطِّفْلِ الَّذِیْنَ لَمْ یَظْهَرُوْا عَلٰی عَوْرٰتِ النِّسَآءِ۪ وَلَا یَضْرِبْنَ بِاَرْجُلِهِنَّ لِیُعْلَمَ مَا یُخْفِیْنَ مِنْ زِیْنَتِهِنَّؕ وَتُوْبُوْۤا اِلَی اللّٰهِ جَمِیْعًا اَیُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
অনুবাদ: আর আপনি মুমিন নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে আর সাধারণতঃ প্রকাশমান অংশ ব্যতীত নিজেদের সৌন্দর্য-শোভা প্রকাশ না করে এবং তারা যেন তাদের মাথায় পরিহিত ওড়না (এবং চাদর) দ্বারা তাদের গ্রীবা এবং বক্ষও আবৃত রাখে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য-শোভা তাদের স্বামী, তাদের পিতা, তাদের আপন শ্বশুর, তাদের পুত্র, তাদের স্বামীর পুত্র, তাদের আপন ভ্রাতা, তাদের আপন ভ্রাতুষ্পুত্র, তাদের আপন ভগ্নিপুত্র, তাদের (স্বধর্মজাত, মুসলমান) নারী, মালিকানাধীন ক্রীতদাসী, যৌন-কামনা রহিত পুরুষ অথবা নারীদের আচ্ছাদিত বিষয়াদি সম্পর্কে অনবগত শিশু ব্যতীত (অন্য) কারো নিকট প্রকাশ না করে। আর (চলার সময়) তারা যেন এমনভাবে পদক্ষেপ না ফেলে যাতে (পায়ের ঝঙ্কারের কারণে) তাদের সে সৌন্দর্য প্রকাশ হয়ে পড়ে যা তারা (শরীয়তের বিধানের আলোকে) লুকিয়ে রাখছে। আর হে মু’মিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহ্র দিকে প্রত্যাবর্তন করো যাতে তোমরা সফলতা লাভ করতে পারো।
{{ সূরাহ নূর-২৪ আয়াত নং-৩১ }}
💠আরও ইরশাদ হয়েছে—
یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ قُلْ لِّاَزْوَاجِكَ وَبَنٰتِكَ وَنِسَآءِ الْمُؤْمِنِیْنَ یُدْنِیْنَ عَلَیْهِنَّ مِنْ جَلَابِیْبِهِنَّؕ
অনুবাদ: হে নবী! আপন বিবিগণ, সাহেবযাদীগণ ও মুসলমানদের নারীগণকে বলে দিন যেন তারা নিজেদের চাদরের একাংশ স্বীয় মুখের উপর ঝুলিয়ে রাখে।
{{ সূরাহ আহযাব-৩৩ আয়াত নং-৫৯ }}
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, পর্দা আল্লাহ তা'লার অন্যতম প্রধান বিধান। তাই একজন স্বামীর উচিত স্ত্রীকে এ বিধান পালনে আন্তরিকভাবে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করা।
💠রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ... وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
অনুবাদ: তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক এবং সে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
(সহীহ বুখারী হাদিস নং- ৮৯৩,, সহীহ মুসলিম হাদিস নং-১৮২৯)
এই হাদিস অনুযায়ী স্বামী তার স্ত্রীর দ্বীনি অবস্থার ব্যাপারে দায়বদ্ধ। তাই তিনি যদি স্ত্রীকে পর্দার গুরুত্ব শিক্ষা না দেন কিংবা পর্দা পালনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না করেন, তবে তিনি নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলেন না।
স্ত্রীকে পর্দাশীল বানানোর অর্থ জোর-জবরদস্তি করা নয়; বরং প্রজ্ঞা, ভালোবাসা, উত্তম চরিত্র, সুন্দর উপদেশ এবং দ্বীনি শিক্ষার মাধ্যমে তাকে পর্দা করতে উদ্বুদ্ধ করা। স্বামী নিজেও যদি ইসলামী আদর্শের অনুসারী হন, তাহলে স্ত্রী তার দ্বারা অধিক প্রভাবিত হন।
🔰প্রিয় পাঠক! একজন স্বামীর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো স্ত্রীর জন্য পর্দার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা। যেমন—শরয়ী বিধান অনুযায়ী ঢিলেঢালা ও শালীন পোশাক, বোরকা, ওড়না বা হিজাব ইত্যাদি কাপড়ের ব্যবস্থা। তদ্রূপ স্ত্রীর পর্দার সহিত বসবাসের জন্য বাসস্থান, ওয়াশরুম ও বাথরুমের ব্যবস্থা করাও স্বামীর দায়িত্ব।
কারণ আল্লাহ তা'লা স্বামীর ওপর স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। পর্দার উপযোগী পোশাক ও বাসস্থানও এই প্রয়োজনীয় ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত।
💠রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছেন-
وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
তোমাদের ওপর তাদের (স্ত্রীদের) অধিকার হলো, তোমরা তাদের ভরণ-পোষণ ও পোশাকের ব্যবস্থা করবে।
{{সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১২১৮}}
অতএব, স্বামী যদি স্ত্রীকে পর্দা করতে বলেন কিন্তু পর্দার উপযোগী পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে না দেন, তাহলে তা দায়িত্ব পালনে অপূর্ণতা হিসেবে গণ্য হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, পর্দা কেবল বাহ্যিক পোশাকের নাম নয়; এটি ঈমান, তাকওয়া, লজ্জাশীলতা ও চরিত্রেরও বিষয়। তাই স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত নিজেদের ঘরে এমন পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামী জ্ঞানচর্চা, নামাজ এবং আল্লাহর ভয় পরিবারকে দ্বীনের পথে অটল রাখবে।
পরিশেষে বলা যায়, একজন স্বামীর প্রকৃত সফলতা শুধু দুনিয়াবি ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্ত্রীকে জান্নাতের পথের সহযাত্রী হিসেবে গড়ে তোলার মধ্যেই তার বড় সফলতা নিহিত। স্ত্রীকে পর্দাশীল হতে উৎসাহিত করা, প্রয়োজনীয় পর্দার সরঞ্জাম প্রদান করা এবং উত্তম আচরণের মাধ্যমে ইসলামী পরিবার গঠন করা একজন মুমিন স্বামীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কর্তব্য। আল্লাহ তা'লা আমাদের সকলকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
✍️খাদিমুল হাদীস মুফতী আমজাদ হুসাইন সিমনানী সাহেব
🔰 Assistant teacher- Pathardanga Osmania High Madrasah
Comments -